,

মন ছুয়ে যায় গারো পাহাড় এলাকার গজনি ‘অবকাশ’

রফিক মজিদ : মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুরি, শাল-গজাড়ি বনের হাতছানি, পাহাড়ি ঝর্ণার কলতান আর আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠির জীবন যাত্রা দেখতে পুরিবার-পরিজন ও বন্ধুদেও নিয়ে চলে আসুন শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের গজনি ‘অবকাশ’। এখানে আসলে এর রূপ আপনার মনকে নাড়া দিবেই। দেশে অন্যান পাহাড় ও বনের মতো নয় এটি। আয়তনে খুব বেশী বড় না হলেও এর প্রাকৃতিক রূপ দেশের অন্য যে কোন পাহাড়-বনের চেয়ে ভিন্নতা রয়েছে। তাই এখানে যে এক বার আসে তার ফিরে যাওয়ার সময় এখানকার প্রকৃতি তাকে পেছন থেকে বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকে।

শেরপুর জেলা সদর থেকে ২৮ কিলোমিটার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেষা প্রায় ৩৫ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি গারো পাহাড়। এই গারো পাহাড়ে দেশের পার্বত্য এলাকার মতো সুউচ্চ পর্বত বা পাহাড় ও লেক না থাকলেও এখানকার শাল-গজাড়ি ঘেরা উচু নিচু টিলা আর পাহাড়ি টিলা বেয়ে সমতলের দিকে ছুটে চলা ছোট ছোট ঝর্না, ঝোড়া ও ছড়া দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির কলকল শব্দ যে কোন প্রকৃতি প্রেমির হৃদয়কে আন্দোলিত করবে। সেই সঙ্গে ওই সব পাহাড়ি টিলার উপর এবং সমতলে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠির নানা সম্প্রদায়দের লোকদের সংস্কৃতি ও জীবন-জীবিকা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে আরো বৃদ্ধি করেছে। যদিও বর্তমানে এই গারো পাহাড় নানা প্রকিুলতার কারনে এর সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তবে এই পাহাড়ের রক্ষনা-বেক্ষন ও নতুন করে সৌন্দর্য বৃদ্ধিসহ নানা পরিকল্পনায় ফিরে আসছে পাহাড়ের অবকাশ কেন্দ্রের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য।

goje_lake
১৯৯৫ সনে তৎকালীন শেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্দোগে জেলার সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতি উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে কাংশা ইউনিয়নে গজনি পাহাড়ের প্রায় ৯০ একর পাহাড়ি টিলায় ‘গজনি অবকাশ কেন্দ্র’ নামে একটি মনোরম পিকনিক স্পট গড়ে তোলা হয়। যদিও বর্তমানে এটি আর শুধুই পিকনিক স্পট নয়, এটি এখন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে। গারো পাহাড় এলাকায় নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক নৈস্বগির্ক ওই পর্যটন কেন্দ্রটিতে এখন বছর জুড়েই হাজার হাজার ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারনায় ভরে উঠে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষা সফর ও বনভোজনে বাস, মাক্রোবাস, প্রাইভেট কার করে হাজার হাজার ভ্রমন পিপাসুরা বেড়াতে আসছে। শীত মওসম ছাড়াও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে উপচে পড়া ভিরে মুখরিত থাকে ওই এলাকার বন-বাদর আর পাহাড়ি টিলায়।

ঝিনাইগাতি উপজেলা অফিস সূত্র জানায়, এখানে প্রতি বছর প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ ভ্রমন করে থাকে। যা থেকে বৎসরে প্রায় আয় হয় ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা। ফলে জেলা প্রশাসন ও সরকারের রাজস্ব খাতে প্রতি বছর আয় হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

বর্তমানে এই পর্যটন কেন্দ্রে দর্শনীয় ও আর্কষনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিহরন জাগানো পাহাড়ের চূড়ায় ‘সাইট ভিউ টাওয়ার’, সূরঙ্গ পথে পাতালপুরী, শিশু পার্ক, মিনি চিড়িয়াখানা, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ, মৎসকন্যা, প্রাগঐতিহাসিক যুগের বিলুপ্ত ডাইনোসর, বাঘ, হাতি, জিরাফ, বানর, কুমির, হরিণসহ বিভিন্ন জীবজন্তুর প্রতিকৃতি। এছাড়াও রয়েছে ভ্রমন পিপাসুদের জন্য ৬ কক্ষ বিশিষ্ট রেষ্ট হাউজ (শুধু মাত্র দিনের বেলা ব্যবহারের জন্য)। টলমল জলের নয়ানিভিরাম লেক। লেকের জলে ভাসছে অত্যাধুনিক প্যাডেল বোর্ড ও ময়ূর পঙ্খি নৌকা এবং লেকের জলের রয়েছে একটি ভাসমান রেস্ট হাউজ। লেকের জলের উপর রয়েছে লেক ভিউ প্যান্টাগন, রয়েছে ঝুলন্ত সেতু। পাহড়ের ওপরে স্থাপিত বাংলো থেকে নেমে আসার জন্য রয়েছে দৃষ্টিনন্দন পদ্মসিড়ি।

abokas_pic-3
ভ্রমনপিপাসুরা জানায়, এখানে একটি রিসোর্ট, ভালো মানের রেষ্টুরেন্ট, খাবার পানি, গণসৌচাগার, সিকিউরিটি ব্যাবস্থা আরো জোরদার, নতুন নতুন আরো রাইট বৃদ্ধি করা উচিত। তবে সম্প্রতি জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ি থেকে ঝিনাইগাতি হয়ে শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্ত সড়ক ও বিভিন্ন ব্রীজের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ সড়কটির কাজ শেষ হয়ে গেলে পর্যটকদের যাতায়াতের ব্যাপক সুবিধা বাড়বে। তারা অবকাশ কেন্দ্র থেকে জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্পট গুলোতে সহজেই যাতায়াত করতে পারবে।

পাহাড়ি ঢলের কারণে গত ২০১৪ সালে অবকাশ কেন্দ্রে মূল আকর্ষন কৃত্তিম লেকটি ধ্বসে যায়। ফরে পানি শূণ্য হয়ে পড়ায় ওই লেক তথা অবকাশ কেন্দ্রের সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। এতে গত বছর পর্যটকদের বিমোহিত করে। ফলে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের উদ্দোগে ওই লেক এবং আরো কিছু নতুন নতুন দর্শনীয় স্থান ও অবকাঠামো তৈরীর উদ্দোগ নেয়া হয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসের মধেই এসব উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ শেষ হলে অবকাশের পুরোনো ঐতিহ্য ফেরার পাশপাশি অবকাশকে নতুন এক পর্যটন কেন্দ্র হিসেব দেখা যাবে বলে স্থানীয় প্রশাসনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি কাজে নিয়োজিত কর্মচারীরা জানান।  এ ক্ষেত্রে দেশের পর্যটন মন্ত্রনালয় ও পর্যটন কর্পোরেশন তথা সরকারি সহযোগীতা ও আর্থিক বরাদ্ধ একান্ত প্রয়োজন বলে ভ্রমন পিপাসুরা দাবী জানিয়েছে।

jarna_pic
যেভাবে যাবেন  : ঢাকা মহাখালি বাসস্ট্যান্ড থেকে শেরপুর জেলা সদরে বেশ কিছু ভাল বাস সার্ভিস রয়েছে। জন প্রতি ভাড়া হচ্ছে ৩০০ টাকা। এরপর শেরপুর জেলা শহরের নবীনগন বাস স্ট্যান্ড থেকে শহরের খোয়ারারপাড় মোড়ে যেতে অটোরিক্সার ভাড়া লাগবে জনপ্রতি মাত্র ১০ টাকা। সেখান থেকে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদরে গিয়ে অথবা সোজা অবকাশ কেন্দ্রে যেতে সিএনজি অটোরিক্সায় জন প্রতি ভাড়া লাগবে মাত্র ৪০ টাকা। এছাড়া শেরপুর জেলা শহর থেকে ভাড়ায় চালিত সিএনজি অটোরিক্সা অথবা মাইক্রোবাস ভাড়া করেও অবকাশে যাওয়া যাবে। দিন চুক্তি ভাড়া নিবে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর যারা ঢাকা থেকে নিজস্ব গাড়ীতে আসতে চান তারা ময়মনসিংহ পার হয়ে সরাসরি শেরপুর জেলা সদর হয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা হয়ে অবকাশে যাওয়া যাবে।

কোথায় থাকবেন : কেউ যদি বেড়াতে এসে রাত্রি যাবন করতে চান তবে শেরপুর জেলা সদরেই থাকতে হবে। কারন ঝিনাইগাতী বা অবকাশে রাত্রি যাপন করার মতো কোন আবাসিক হোটেল নেই। শেরপুর জেলা শহরে হাতে গোনা দুই তিন টি ভাল মানের আবাসিক হোটেল ছাড়াও ভিআইপিদের জন্য জেলা সার্কিট হাউজ, জেলা পরিষদ ও এলজিইডি’র রেস্ট হাউজ রয়েছে। সেগুলোতে রাত্রি যাপন বা রেস্ট নিতে গেলে সংশি¬ষ্ট অফিসে অগ্রিম বুকিং দিতে হবে। জেলা পরিষদের রেস্ট হাউজের প্রতি কক্ষ এক রাতের জন্য ভাড়া ৫০ টাকা, এলজিইডি’র প্রতি কক্ষ ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং সার্কিট হাউজের প্রতি কক্ষ ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। তবে ওইসব সরকারী রেস্ট হাউজ ও সার্কিট হাউজে সরকারী কর্মকর্তাদের নাম মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে রাত্রী যাপন করতে পারবেন। এছাড়া শহরের আবাসিক হোটেল গুলোর মধ্যে হচ্ছে হোটল সম্পদ, আয়সার ইন, ফ্রিডম ও কাকলি গেস্ট হাউজ অন্যতম। এসব হোটেলের রুম ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত (এসি ও নন এসি)।

কোথায় খাবেন :  সীমান্ত এলাকায় ভাল মানের কোন খাবার হোটেল নেই। তবে শেরপুর জেলা শহরে ভাল মানের খাবার হোটেল রয়েছে হাতে গোনা ২ থেকে ৩ টি। এসবের মধ্যে চাইনিজ ও বাংলা খাবারের হোটেল আলিশান, সম্রাট, আহার ও শাহজাহান। জেলার বাইরে থেকে এই সীমান্ত এলাকার গারো পাহাড়ে বেড়াতে এসে রান্না-বান্নার ব্যাবস্থা না করতে পারলে শহরের ওইসব খাবার হোটেল থেকে খাবারের জন্য অগ্রিম বুকিং দিলে প্যাকেট সরবরাহ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2016 allrights reserved to AlokitoSherpur.Com | Desing & Developed BY Popular-IT.Com Server Managed BY PopularServer.Com