,

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলা ভুমি ‘মধুটিলা ইকোপার্ক’

রফিক মজিদ : ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেষা শেরপুর জেলার প্রায় ৩৫ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি গারো পাহাড়। এই গারো পাহাড়ে দেশের পার্বত্য এলাকার মতো সুউচ্চ পর্বত বা পাহাড় ও লেক না থাকলেও এখানকার শাল-গজাড়ি, ইউকিলিপটাস-একাশিয়া, সেগুন-মেহগিনি, মিনঝিরিসহ নানা প্রজাতির গাছগালি ঘেরা উূঁচু নিচু টিলা আর পাহাড়ি টিলা বেয়ে সমতলের দিকে ছুটে চলা ছোট ছোট ঝর্ণা, ঝোড়া ও ছড়া দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির কলকল শব্দ যে কোন প্রকৃতি প্রেমির হৃদয়কে আন্দোলিত করবে। সেই সঙ্গে ওই সব পাহাড়ি টিলার উপর এবং সমতলে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠির নানা সম্প্রদায়দের লোকদের সংস্কৃতি ও জীবন-জীবিকা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে আরো বৃদ্ধি করেছে।

1
পাহাড়ের চূড়ায় ওয়াচ টাওয়ারে দাড়িয়ে উচু-নিচু পাহাড়ের গায় মেঘ-রোদ্দুরের খেলা আর সীমান্তের ওপারের ভারতীয় অধিবাসিদের ঘর-বাড়ি’র দৃশ্য মন ছুয়ে যায়, হৃদয়কে উদ্বেলিত করে। সেই সাথে এই গারো পহাড়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেড়াতে আসা হাজার হাজার নর-নারী ও প্রেমিক-প্রেমিকার এ যেন মিলন মেলা ও হাট বসে।
১৯৯৯ সনে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তরে ময়মনসিংহ বন বিভাগের ব্যবস্থাপনাধীন পোড়াগাঁও ইউনিয়নের মধুটিলা ফরেষ্ট রেঞ্জের সমেশ্চূড়া বীটের আওতায় ৩৮০ একর পাহাড়ি টিলার উপর “মধুটিলা ইকো পার্ক” নামে মনোরম পিকনিক স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। গারো পাহাড় এলাকায় নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক নৈস্বর্গিক ওই পিকনিক কেন্দ্রে এখন হাজার হাজার ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারনায় ভরে উঠেছে। প্রতি বছর শীত মওসুমে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষা সফর ও বনভোজনে বাস, মাক্রোবাস, প্রাইভেট কার করে হাজার হাজার ভ্রমন পিপাসুরা বেড়াতে আসছে।

3
ময়মনসিংহ বন বিভাগ ১৯৯৯ সন থেকে ইকো পার্কের প্রাথমিক অবকাঠামো ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ দুই পর্যায়ে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ শেষ করে ২০০৬-০৭ অর্থ বছর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইকো পার্কের যাত্রা শুরু হয়।
ইকোপার্ক সূত্রে জানা গেছে, এই ইকো পার্কে বর্তমানে সুদৃশ্য প্রধান ফটক, ডিসপ্লে¬¬ মডেল, তথ্য কেন্দ্র, গাড়ী পার্কিং জোন, ক্যান্টিন, ওয়াচ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা, মনোরম লেক ও বোটিং, স্টার ব্রীজ, স্ট্রেম্পিং রোড বা সুউচ্চ পাহাড়ে উঠার জন্য ধাপ রাস্তা (সিঁড়ি), মিনি শিশু পার্ক, মহুয়া রেষ্ট হাউজ, স্টীলের ছাতা, ইকো ফ্রেন্ডলি বেঞ্চ, আধুনিক পাবলিক টয়লেট, পার্কের প্রবেশ পথ ধরে যাওয়া বিভিন্ন সড়কের পার্শ্বে স্থাপন করা হয়েছে হাতি, হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, বানর, কুমির, ক্যাঙ্গারু, মৎস্য কন্যা, মাছ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জীব জন্তুর ভাষ্কর্য রয়েছে। এছাড়া আরো রয়েছে বিরল প্রজাতি, পশু পাখি আকৃষ্ট, ঔষধী ও সৌন্দর্য বর্ধক প্রজাতির গাছের বাগান, মৌসুমী ফুলের বাগান এবং সাত রঙের গোলাপ বাগান। পার্কের উচু টিলার উপর ৩ কামরা বিশিষ্ট সুদৃশ্য বাংলো বা ‘মহুয়া রেস্ট হাউজ’ ব্যাবহার করতে হলে ময়মনসিংহ অথবা শেরপুর বন বিভাগ অফিস থেকে প্রতিদিনের জন্য ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০০ টাকা ভ্যাটসহ মোট ৪৭০০ টাকায় ভাড়া নিতে হবে।

4
স্থানীয় বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, যেভাবে এই পার্কে দর্শনার্থী বা ভ্রমণ পিপাসুদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে সরকারের এই স্পট থেকে বছরে কোটি টাকার উপরে রাজস্ব আয় হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তবে সেজন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণ পিপাসুদের নিরাপত্তা, পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিসহ ইকো পার্ক থেকে নন্নী হয়ে তিনআনী বাজার মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা প্রসস্থকরণ খুবই জরুরী। এতে দেশের দূর দুরান্তের বিভিন্ন লাক্সারী বাস ও কোচ সহজেই ইকো পার্কে আসতে পারবে।
ভ্রমনকারীরা জানায়, যেহেতু সরকার এই পার্ক থেকে বছরে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছে, তাই এই পর্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও রক্ষনা বেক্ষনের জন্য জরুরী বরাদ্দের প্রয়োজন।

2
যেভাবে যাবেন : ঢাকা মহাখালি বাসস্ট্যান্ড থেকে শেরপুর জেলা সদরে বেশ কিছু ভাল বাস সার্ভিস রয়েছে। জন প্রতি ভাড়া হচ্ছে ৩০০ টাকা। এরপর শেরপুর জেলা সদরের লোকাল বাস স্ট্যান্ড থেকে নালিতাবাড়ি উপজেলার নন্নী বাজার পর্যন্ত লোকাল বাসে জন প্রতি ৩০ টাকায় অথবা সিএনজি চালিত অটোরিক্সায় যেতে ভাড়া লাগবে জন প্রতি ৬০ টাকা। এরপর মধুটিলা ইকো পার্ক পর্যন্ত রিক্সা বা ব্যাটারি ও সিএনজি চালিত অটো রিক্সায় যাওয়া যাবে। এতে জন প্রতি ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা এবং রিজার্ভ ভাড়া নিবে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এছাড়া শেরপুর জেলা শহর থেকে ভাড়ায় চালিত সিএনজি অটোরিক্সা অথবা মাইক্রোবাস ভাড়া করেও ইকো পার্কে যাওয়া যাবে। দিন চুক্তি ভাড়া নিবে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া মধুটিলা ইকো পার্ক থেকে ভোর ৬ টায় প্রতিদিন ঢাকার মিরপুর পর্যন্ত এবং মিরপুর থেকে প্রতিদিন বেলা ২ টায় ইকো পার্ক পর্যন্ত যাতায়াত করছে। আর যারা ঢাকা থেকে নিজস্ব গাড়ীতে আসতে চান তারা ময়মনসিংহ পার হয়ে সরাসরি শেরপুরের নকলা উপজেলা থেকে শেরপুর জেলা সদরে না এসে নালিতাবাড়ি উপজেলা হয়ে মধুটিলা যাওয়া যাবে।
কোথায় থাকবেন : কেউ যদি বেড়াতে এসে রাত্রি যাবন করতে চান তবে শেরপুর জেলা সদরেই থাকতে হবে। কারন সীমান্তবর্তী এলকা বিধায় ইকো পার্কের রেষ্ট হাউজে সর্বসাধারণের রাত্রী যাপনের অনুমতি নেই। নালিতাবাড়ি বা অবকাশে রাত্রি যাপন করার মতো কোন আবাসিক হোটেল নেই। শেরপুর জেলা সেক্ষেত্রে রাত্রী যাপন করতে হবে শেরপুর জেলা শহরেই। কারণ নালিতাবাড়িতে থাকার মত পরিবেশের কোন আবাসিক হোটেল হয়নি এখনও। শেরপুর জেলা শহরে হাতে গোনা দুই তিন টি ভাল মানের আবাসিক হোটেল ছাড়াও ভিআইপিদের জন্য জেলা সার্কিট হাউজ, জেলা পরিষদ ও এলজিইডি’র রেস্ট হাউজ রয়েছে। সেগুলোতে রাত্রি যাপন বা রেস্ট নিতে গেলে সংশি¬ষ্ট অফিসে অগ্রিম বুকিং দিতে হবে। জেলা পরিষদের রেস্ট হাউজের প্রতি কক্ষ এক রাতের জন্য ভাড়া ৫০ টাকা, এলজিইডি’র প্রতি কক্ষ ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং সার্কিট হাউজের প্রতি কক্ষ ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। তবে ওইসব সরকারী রেস্ট হাউজ ও সার্কিট হাউজে সরকারী কর্মকর্তাদের নাম মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে রাত্রী যাপন করতে পারবেন। এছাড়া শহরের আবাসিক হোটেল গুলোর মধ্যে হচ্ছে হোটল সম্পদ, আয়সার ইন, ফ্রিডম ও কাকলি গেস্ট হাউজ অন্যতম। এসব হোটেলের রুম ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত (এসি ও নন এসি)।
কোথায় খাবেন : সীমান্ত এলাকায় ভাল মানের কোন খাবার হোটেল নেই। তবে শেরপুর জেলা শহরে ভাল মানের খাবার হোটেল রয়েছে হাতে গোনা ২ থেকে ৩ টি। এসবের মধ্যে চাইনিজ ও বাংলা খাবারের হোটেল আলিশান, স¤্রাট, আহার ও শাহজাহান। জেলার বাইরে থেকে এই সীমান্ত এলাকার গারো পাহাড়ে বেড়াতে এসে রান্না-বান্নার ব্যাবস্থা না করতে পারলে শহরের ওইসব খাবার হোটেল থেকে খাবারের জন্য অগ্রিম বুকিং দিলে প্যাকেট সরবরাহ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2016 allrights reserved to AlokitoSherpur.Com | Desing & Developed BY Popular-IT.Com Server Managed BY PopularServer.Com