,

মাথার চুলে ভাগ্য বদল !

রফিক মজিদ : চিরিুনী দিয়ে আঁচড়ানো নারীদের ঝড়ে পড়া মাথায় চুল সংগ্রহ করে এবং তা নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিক্রি করে ভাগ্য বদল করে দিয়েছে শেরপুর জেলা সদরের ৩ টি ইউনিয়নের প্রায় ১৫ টি গ্রামের কমপক্ষে ১৫ হাজার নারী।

ওইসব গ্রামের বেকার, বিধবা বৃদ্ধা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীরা তাদের সাংসার ও লেখা-পড়ার ফাঁকে এসব চুল পক্রিয়ার কাজ করে অনেকেই স্বাবলম্বী, কেউবা সংসারের বাড়তি আয় যোগ, কেউ বা আবার নিজেদের বিভিন্ন কাজে খরচ জোগাচ্ছে। এসব চুল পক্রিয়া করণের সাথে জড়িত মূল ব্যবসায়ীদের অনেকের ভাংগা ঘর-বাড়ি থেকে গড়ে তুলেছে পাকা ঘর-বাড়ি। এসব চুল পক্রিয়ার মূল ব্যবসার সাথে পুরুষরা জড়িত থাকলেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে শতভাগ নারী।

সরেজমিনে গিয়ে জানাগেছে, শেরপুর সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত বাদা তেঘুরিয়া গ্রামের কালু মিয়া এক সময় ঢাকা উত্তরায় একটি হেয়ার ক্যাপ কোম্পানীতে কাজ করতেন। ২০০৭ সালে তিনি বাড়ি ফিরে এসে পরিকল্পনা করেন নিজেই গ্রাম-গঞ্জ ও শহর থেকে বিভিন্ন বাসা-বাড়ি’র মহিলাদের কাছ থেকে চিরুনীর মধ্যে ঝড়ে পড়া মাথার চুল সংগ্রহ করে তা পক্রিয়া করে ঢাকায় ওই হেয়ার ক্যাপ এবং চায়না বায়ারের কাছে বিক্রি করবে।

কথা মতো কাজ, গ্রামের বেকার কয়েকজন তরুনকে দিয়ে হরেক রকমের মালামাল দিয়ে শুরু করেন তার ব্যবসা। প্রথমে গ্রামের বেশ কয়েকজন বেকার যুবককে উদ্বুদ্ধ করে তাদেরকে হরেক মাল (সাংসারের বিভিন্ন সরঞ্জামাদি, শিশুদের প্লাষ্টিকের বিভিন্ন খেলনা) দিয়ে পাঠানো হয় শহর-বন্দর-গ্রামে। তারা সাইকেলে করে হরেকমাল সাজিয়ে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে মহিলাদের কাছ থেকে ওই হরেক মালের বিনিময়ে সংগ্রহ করেন চিরুনীতে ঝড়ে পড়া মাথার চুল। এরপর তারা গ্রামের ওই মহাজনের কাছে ৮ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন।

মাহাজন বা ব্যবসায়ীরা সে চুল কিনে নিয়ে গ্রামের বেকার, বিধবা বৃদ্ধা এবং দরিদ্র পরিবারের বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীর দিয়ে প্রথমে চুল বাছাই, এরপর ওই চুল সেম্পু দিয়ে ওয়াশ করে এবং সর্বশেষ বিভিন্ন সাইজের চুলের আলাদা মুঠি বা গোছা করা হয়। পরবর্তিতে তা ঢাকায় চায়না বায়ারের কাছে গিয়ে সরাসরি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তবে লম্বা চুলের কদর বেশী। সেগুলো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়।

এদিকে দুই-তিন বছরের মধ্যেই গ্রামের কালুর দেখাদেখি আরো অনেক বেকার যুবক লেগে যায় এ ব্যবসায়। গত ১০ বছরের ব্যবধানে ওই গ্রামের পাশপাশি সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের বাদা তেঘুরিয়া, চৈতনখিলা, গাংপাড়, তারাগড়, বালুয়াকান্দা, ভাটিয়াপাড়া, গাজির খামার ইউনিয়নের পলাশিয়া, ধলা ইউনিয়নের পাঞ্জরভাঙ্গা ও গির্দাপাড়াসহ ১০ টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার নারী চুল বাছাইয়ের সাথে জড়িত হয়ে নিজেদের অভাব ঘুচিয়ে হয়েছেন স্বাবলম্বী।

কেউবা তাদের সংসারে বাড়তি আয় করছে, কেউবা নিজেদের পোষাক কিনছে, আবার কেউবা নিজেদের পড়াশোনার কাজে ব্যায় করছে। তবে বয়স্ক নারীরা বিশেষ করে বিধবা মহিলারা তাদের নিজেদের ওষুদ এবং সাংসারিক নানা কাজে ওই আয়ের টাকা খরচ করছে বলে জানালেন অনেক নারী।

হকার বা হরেক মালের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জট লাগানো চুলগুলো প্রথমে জট ছাড়ানো এবং তা বিশেষ কায়দায় সোজা করে সেগুলো মুঠি করতে গ্রামের বেকার, দরিদ্র কিছু শিক্ষার্থী এবং বিধবা বয়স্ক নারী ওইসব চুল ব্যবসায়ীর বাড়িতে গিয়ে লাইন ধরে বসে পড়ে। সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত কাজ করলেও দুপুরের খাবার এবং সাংসারের অন্যান্য কজকর্ম সেড়ে আবারও বসে পড়ে এ কাজে। সারাদিন সর্বচ্চো ১০০ গ্রাম পর্যন্ত চুল বাছাই করতে পারে এক জন শ্রমিক।

সে হিসেবে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে মাসে ১ হাজার ৫ শত টাকা করে দেওয়া হয় প্রতি শ্রমিককে। কেউ বা আবার রাতের বেলা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বাড়তি কাজ করলে মাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকাও পেয়ে থাকে বলে জানালেন মালিক পক্ষ।

নারী শ্রমিকদের চুল বাছাই শেষ হলে মালিক পক্ষেরও অনেক কাজ থাকে। জটলাগা চুল সোজা করার পর এসব চুল ধোয়ামোছা এবং শুকিয়ে পাক্রিয়াজাত করেন বাড়ির মহিলারাই। এরপর প্যাকেট করে ঢাকায় চায়না বায়ারের কাছে নিয়ে বিক্রি করা হয়।

সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের বাদা তেঘুরিয়া গ্রামের চুল ব্যবসায়ী কালা মিয়া জানায়, আমরা বর্তমানে আমাদের ভাগ্য বদল করলেও ইদানিং চায়না বায়াররা অনেক সময় চুলের মূল্য কম দিতে চায়। আমাদের পুজি কম থাকার কারণে অনেক সময় কম দামেই সে চুল বিক্রি করতে হয়। সরকারী ভাবে যদি আমরা কোন ঋন পেতাম তাহলে আমাদের ব্যবসার পরিধি আরো বাড়াতে পারতাম।

একই ইউনিয়নের তারাগড় গ্রামের হামিদ খন্দকার জানায়, আমি আগে অটো চালাতাম, এখন আমার বাড়ি বিল্ডিং করছি আর এক শত নারী শ্রমিক খাটাইতাছি। আমি এহন বেশ ভালো আছি। এছাড়া আমাদের আশপাশের দশ গ্রামের নারীরা বেশ ভালো আছে। তারা টাকার পরিমান যাই পায়, তা দিয়ে তারা বেশ সুখে আছে।

বিধরা খুকি বেওয়া জানায়, চুলের কাজ করি বলে বুড়া বয়সেও পুলাপানের মুহের দিহে (মুখের দিকে) চাইয়া থাহন নাগে না। নিজের ওষুদ নিজেই কিনি। গৃহিনী সমলা, রিতা, রিপা, ইতি, জোসনা জানায়, বাইত বইয়া (বাড়ীতে বসে) সামান্য আয় হইলেও ভাল আছি। স্বামী সংসারে সাহায্য করবার পাইতাছি।

এইচএসসিতে পড়ুয়া শিক্ষাথী উম্মে তামান্ন জোনাকি জানায়, এই কাজে বাবাকে সাহযোগীতা করতাছি, আর আমার জামা-কাপড় বানাইতাছি। পড়াশুনার খরচেও বাবার আর কষ্ট হয়না।

বিসিক এর উপ ব্যবস্থাপক তামান্না মহল জানায়, শুনেছি ওইসব গ্রামে অনেক মহিলা চুলের কাজ করে স্বাবলম্বি হচ্ছে। তবে আমাদের কাছে কেউ যদি কোন সহযোগীতা বা ঋনের জন্য আসে তবে তাদের আমরা সার্বিক সহযোগীতা করবো।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক আনারকলি মাহবুব জানায়, বিষয়টি আমি শুনেছি তবে দেখিনি। আমি সেখানে গিয়ে দেখবো তাদের কি কি সমস্যা আছে এবং তাদের কোন টেকনিক্যান সাপোর্টের প্রয়োজন আছে কিনা তা দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2016 allrights reserved to AlokitoSherpur.Com | Desing & Developed BY Popular-IT.Com Server Managed BY PopularServer.Com