,

ঝাউগড়া গণহত্যা : অযত্ব আর অবহেলার ৪৮ বছর…!

আলোকিত ডেস্ক : আজ ১০ মে শেরপুর সদর উপজেলার লছমনপুর (তৎকালে ভাতশালা) ইউনিয়নের ঝাউগড়া গণহত্যার ৪৮ বছর। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক সেনারা ঝউগড়া গ্রামে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় হামলা চালিয়ে হত্যা করে শহরের কালিরবাজার মহল্লার বাসিন্দা সংখ্যালুঘু পরিবারের ৮ সদস্যকে। সেইসাথে তারা লুটতরাজ ও অগ্নি সংযোগ চালায় ওই গ্রামে। এসময় সারিরিক নির্যাতনের শিকার হয় আরো অনেক গ্রামবাসী।

স্বাধিনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজো ওই শহীদ পরিবারের এবং ঝাউগড়া গ্রামে কেউ তোন খোজও নেয়নি। আজো ওই গ্রামে চিহিৃত করা হয়নি কোন গণকবর ও নামের স্মৃতি ফলক। ওই শহীদ পরিবারের স্মরণে তৎকালীন ও বর্তমান পৌরসভার মেয়র গোলাম কিবরিয়া লিটনের উদ্যোগে ২০০৮ সালে ১২ মে শহরের কালির বাজার কলাহাটি মোড় থেকে নয়আনী বাজার হয়ে খরমপুর মোড় পর্যন্ত ‘ঝাউগড়া শহীদ সরনী’ ঘোষনা করে খরমপুর মোড়ে ওষুধ নিলয়ের সামনে “ঝাউগড়া শহীদ সরনী” নামে একটি নাম ফলক স্থাপন করা হয়। কিন্তু ওই স্মৃতি ফলকটিও দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর যাবত মাটি উপড়ে পড়ে থাকলেও কেউ নজনে নেয়নি।

মুক্তিযদ্ধে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ইতিহাস ও বাংলা একাডেমীর লেখক আমিনুর রহমান সুলতানের লেখার সূত্র অনুযায়ী জানাগছে, তৎকালীন জামালপুর মহকুমার শেরপুর থানার অন্তর্গত ভাতশালা ইউনিয়নের ঝাউগড়া নিভৃতচারী এই গ্রামটিতে শেরপুর থেকে যাতায়াতের তেমন যোগাযোগ ছিল না। রাস্তাঘাট ছিল খানাখন্দে ভরপুর ও ভাঙ্গা।

এই গ্রামের বাসিন্দা মহেন্দ্র দেব। প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ভেঙ্গে পড়ার পরপরই গ্রামের সবাই ছুটে যাচ্ছে ভারতে আশ্রয় নেবার জন্য, এসময় মহেদ্র দেব নিভৃত গ্রামেই থেকে গেলেন। আর নিজ বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করার জন্য তার ঘনিষ্ট বন্ধু শেরপুর শহরের নয়আনী বাজার (কালির বাজার) মহল্লার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী চৌথমল কারুয়াকে আহ্বান জানালেন। চৌথমল তার মহল্লাতেও ছিলেন সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে কয়েকটি পরিবার তার উপর ছিল আস্থাশীল। তাই তিনি যখন তার বন্ধু বাড়ি ঝাউগড়ায় যেতে সিদ্ধান্ত গ্রহন করলেন তখন একই মহল্লার কয়েকটি পরিবার তার সঙ্গী হলেন।

ঝাউগড়ায় আশ্রয় নেওয়া চৌথমল কারুয়ার পরিবারের মধ্যে তার স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ২ মেয়েসহ দেবী চরণ নামের একজন গৃহপরিচায়ক এবং দোকানের কর্মচারী গোপেশ্বর সাহা মিলে ৮জন। এছাড়া তার সহোদের ভাই জিতমহল কারুয়ার স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে, চৌথমলের ঘনিষ্ট বন্ধু নিবারণ সাহা ও তার পরিবারের ৪ ছেলে, ৪ মেয়ে, নিকটতম প্রতিবেশী কান্তি বসাক, দীনেশ বসাকের শ্যালক নীহার বসাক (ময়মনসিংহ)। এছাড়া আরো কয়েকটি পরিবার ওই গ্রামে আশ্রয় নিলেও তার কযেকদিন পরে তারা ফিরে যায়।

এদিকে শেরপুর শহরের পাকিস্থানপন্থী দালাল ফজু মুন্সী, সৈয়দ আলী চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আল বদর রাজাকারের সহযোগীতায় ১৯৭১ সালের ১০ মে দুপুরের খাবারের পর আকস্মিক ভাবে পাকসেনারা মহেন্দ্র দেবের বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় পাকসেনাদের হামলার খবর পেয়ে দুর থেকেই অনেকেই দৌড়ে পালিয়ে যায়। আবার অনেকেই গ্রামেই লুকিয়ে পড়ে।

এসময় পাকসেনাদের সাথে ছিলেন শেরপুর থানার তৎকালীন ওসি সিদ্দিক। ওসির সঙ্গে পরিচয় ছিল ব্যবসায়ী চৌথমল কারুয়ার। ফলে ওসির ডাকে সাড়া দিয়ে চৌথমল সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর মুহুর্তের মধ্যেই উপস্থিত ১৬ জনকে গরুর দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে শুরু করা হয় নির্যাতন। এদিকে আরেক দল পাকসেনা বাড়ির ভিতর নারী ও শিশুদেরকে বাড়ির রান্না ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখে।

এসময় শিশু ও নারীদের কান্নাকাটি এবং তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের কাছে সোনা-দানা ও টাকা-পয়সা যার যা আছে তা দিয়ে দিতে বলেন পাকসেনারা। এসময় নারীদের কাছে থাকা সকল সোনা-দানা (অলংকার) ও টাকা পয়সা যা ছিল তা দিয়ে দেন।

সূত্রানুযায়ী জানাযায়, সেসময় চৌথমলের একটি ছোট স্বর্নের সিংহাসন ছিল। ওই সিংহাসন দেখে পাকসেনারা রেগে গালি দিয়ে বলেন, ‘ওই সিংহাসনে কাকে বসাবে তোমরা- শেখ মুজিবকে, নাকি তোমাদের নিজাম বাবাকে।’ (তৎকালে নিজাম উদ্দিন ছিলেন সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’র সভাপতি এবং সত্তরের নির্বাচনে এমপিও এবং বর্তমান পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়া লিটনের পিতা )।

এসময় চৌথমলকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে সরিরের হাড়গোড় এবং দাঁত ভেঙ্গে দেয়। এক পর্যায়ে তার বড় ছেলে কালিদাস কারুয়াকে তার সামনেই দাঁড় করিয়ে তিন তিনটি গুলি করে। সৌভাগ্যক্রমে গুলিগুলো তার কানের এবং মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। এসময় তাকে পাকসেনাদের রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে আঘাত করে ছেড়ে দেয়। এরপর ওই ১৬ জনের মধ্যে ৮ জনকে পাশ্ববর্তী ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদী মৃগী’র পাড়ে দাঁড় করিয়ে গলি করে হত্যা করে।
ওই দিন পাক সেনাদের হাতে নিহত শহীদরা হলো, চৌথমল কারুয়া, নিবারণ চন্দ্র সাহা, গোপেশ্বর সাহা, নিহার বসাক, মহেন্দ্র দে, চিত্ত বিশ্বাস, নেপাল বিশ্বাস ও ভক্তরাম বিশ্বাস।

কিন্তু স্বাধিনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজো তাদের নামে ওই গ্রামে স্থাপন করা হয়নি কোন স্মৃতি চিহৃ বা শহীদদের নাম ফলক। শেরপুরের ওই ঝাউগড়সহ অন্যান্য গণহত্যা ও মক্তিযুদ্ধে স্মৃতিবাহি স্থানগুলোতে শহীদদের নাম ফলক নির্মানের দাবী জানিয়েছে শেরপুরের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের লোকজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2016 allrights reserved to AlokitoSherpur.Com | Desing & Developed BY Popular-IT.Com Server Managed BY PopularServer.Com