,

সৈনিক শাহীন আরেক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা…!

রফিক মজিদ : জার্মানির হ্যামিলন শহরে বাঁশিওয়ালা তার বাঁশির সুরে প্রথমে ইদুর এবং পরবর্তিতে তার পারিশ্রমিক না পেয়ে শহরের সকল শিশুদের অজানা উদ্যেশে নিয়ে গেছেন তার যাদুকরি বাঁশির সুরে। অর্থাৎ হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালার বাঁশির যাদুকরি সুরে ইদুরের মতো শিশুরাও তার পিছু নিয়েছিল। সে এক ভিন্ন গল্পের ভিন্ন চিত্র। তবে শেরপুরে ওই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত সৈনিক শাহীন মিয়া নামের তেমনি এক তরুনের অদৃশ্য বাঁশির সুরে তার পিছু নিয়েছে অসংখ্য দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী। তবে তারা হ্যামিলনের সেই অন্ধ গুহার দিকে নয়, তারা অনিশ্চিত জীবন থেকে ছুটে চলেছে আলোর পথে।

এসব দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে শিক্ষা জীবন থেকে ছিটকে পড়ে অনিশ্চিত জীবনে চলে যাচ্ছিল ঠিক তখনি শাহীন মিয়া তার অদৃশ্য বাঁশির সুরে তাদের আলোর পথে নিয়ে আসতে সক্ষম হোন। এক সময় স্কুল পড়ুয়া শারমিন-নমিতা-নাসিমারা শাহীন মিয়ার প্রচেষ্টায় বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ল, কবি নজরুল ও শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ণরত।

আর ছেলেদের মধ্যে অনেকেই অভাবের টানাপোড়েনে কেবলমাত্র সংসারের হাল ধরতে পড়াশোনা বাদ দিয়ে দিনমজুর, কাঠমিস্ত্রি, রং মিস্ত্রি, চা-বিক্রেতা, গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজ নিলেও শাহীনের বাশির সুরে এখন তারা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুটেক্স, প্রাচীনতম বিদ্যাপিঠ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়, জাহাংগীর নগর বিশ^বিদ্যালয়, নোয়াখালি বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভবিষ্যত জীবন গড়তে।

অদম্য এসব দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীর গল্প এক বা দুই বছরের নয়, প্রায় এক যুগের। সৈনিক শাহীন মিয়ার অদৃশ্য যাদুকরি বাঁশির সুরে শেরপুরের সাড়ে তিন শতাধিক দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী শত অভাবকে পায়ে দলে ফিরে এসেছে শিক্ষা জীবনে। আস্তে আস্তে গড়ে তুলছে আলোর যাত্রার দীর্ঘ লাইন।

গত এক যুগে শাহীন মিয়ার অদৃশ্য বাঁশির সুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষার্থীর পাশাপাশি ৫ম থেকে একাদশ শ্রেনীতে প্রায় ৩৫০ জন্য শিক্ষার্থী এগিয়ে যাচ্ছে আলোকিত জীবন গড়তে। সম্প্রতি ঘোষিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ১২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এদের কারো ঘর নেই, চাল নেই, চুলো নেই। নেই কোন পড়নের ভালো কাপড়। এদের দারিদ্যের তীব্রতাও কল্পানাতীত। কেবলমাত্র শাহীন মিয়ার সমান্য সহযোগীতা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সঠিক পরামর্শে এসব শিক্ষার্থী ফিরে পেয়েছে তাদের আলোর ঠিকানা। যদিও এ আলোর পথের শেষ প্রান্তে যেতে তাদের এখন একমাত্র বাঁধা অর্থ। নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এসব শিক্ষার্থী বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাঙ্গনে বিচরণ করলেও শাহীন মিয়ার সেই অদৃশ্য বাঁশির সুরে দলে দলে ছুটে আসছে আরো অনেক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু শাহীনের একার পক্ষে এসব শিক্ষার্থীর দায়িত্ব কাধে নিয়ে পথচলা অনেকটাই কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে।

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের ঘোড়জান গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষকের সন্তান শাহীন মিয়া। ২০০১ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। সততা, শৃংখলা আর আদর্শ তার মধ্যে দারুনভাবে প্রভাব ফেলে। আর তাই যখন তিনি ছুটি পান তখন বাড়িতে এসে অন্যসব সেনা সদস্যের মতো বাড়িতে বসে বা আত্মিয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের সাথে সময় না কাটিয়ে খুজে বেড়ান ঝরে পড়া দরিদ্র মেধাবীদের।

তিনি প্রথমে তার নিজ গ্রাম এবং তারপর তার আশপাশ গ্রামে দেখেন মাধ্যমিকের সিড়িঁ পাড় না হতেই ঝরে পড়ে অনেকেই। এসময় ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের নানা ভাবে বুঝিয়ে তাদেরকে স্কুলগামী করেন। সহায়তা দেন শিক্ষা উপকরণ। এভাবে বাড়তে থাকে ঝরে পড়াদের স্কুলমূখী হওয়ার সংখ্যা।

প্রথমত একক প্রচেষ্ঠায় নিজ এলাকায় কাজ করেছেন। পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে ইউনিয়ন। পরে এর বিস্তৃতি ঘটে জেলার সর্বত্র। জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ি, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবর্দী উপজেলার অর্ধশত স্কুলের শত শত শিক্ষার্থীর কাছে শাহীন ভাই একজন আলোর দূত হিসেবে ব্যাপক পরিচিত লাভ করেছেন। ওইসব এলাকার কেউ কেউ তাকে ‘শিক্ষার ফেরিওয়ালা’ হিসেবেও ডাকেন।

সৈনিক শাহীন মিয়া ছুটি থাকাকালীন কখনো পায়ে হেটে, আবার কখনো বাইসাইকেলে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে ছুটে যান জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিশেষ করে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার দুর্গম গ্রাম ও স্কুলগুলোতে, তখন ওইসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা দলে দলে ছুটে আসে শাহীনের সানিধ্য পেতে এবং তার কাছ থেকে আলোর জগতের কথা শুনতে। তাদের করুণ অবস্থা দেখে শাহিন মিয়াও স্বপ্ন দেখেন ভবিষৎতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার।

২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া তার এ কার্যক্রমকে সাংগঠনিক রূপ দিতে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থী উন্নয়ন সংস্থা’ (The development Organization for the helpless and poor students)  সংক্ষেপে-‘DOHPS’ ।

এরপর ২০১১ সালে জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধনও পান। এদিকে শিক্ষা, সমাজ উন্নয়নে সৈনিক শাহীন মিয়া কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে রাষ্টপতি কর্তৃক ‘বিশিষ্ট সেবা পদক’ বিএসপি’তে এ ভূষিত হন । তিনি বর্তমানে ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট হতে অস্থায়ী বদলিতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর-বিএনসিসি’তে কর্মরত।

ডপস এর প্রতিষ্ঠাতা শাহীন মিয়া বিএসপি বলেন, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন চাহিদা পুরন, দরিদ্র অসহায় শিক্ষার্থীদের মাঝে নিয়মিত শিক্ষা উপকরণ বিতরণে অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তারাসহ মাঝে মধ্যে কেউ কেউ এককালীন ও নিয়মিত সহায়তা করে ‘ডপস’ এর সেবাকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন। তবে কাজের পরিধি সামলাতে প্রয়োজন আরও অর্থের। সমাজের হৃদয়বান ব্যাক্তিরা এগিয়ে আসলেই আরো সহজ হয়ে যায় এ পথ চলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2016 allrights reserved to AlokitoSherpur.Com | Desing & Developed BY Popular-IT.Com Server Managed BY PopularServer.Com